একসময়ের পরিচিত বর্ষার শহর সিলেট এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ গ্রাসে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং অসহনীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এই অঞ্চল দ্রুত 'হিট আইল্যান্ড' বা উত্তপ্ত দ্বীপে পরিণত হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে সিলেটে জুন মাসে প্রায় ১৭ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হলেও, বর্তমানে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্রে ভয়াবহ পরিবর্তন এসেছে। স্বাভাবিক সময়ের বাইরে অনিয়মিত ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এখন সিলেটের নিত্যদিনের চিত্র। আবহাওয়ার এই চরম অস্বাভাবিকতা প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখানকার ঋতুচক্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের এই অস্বাভাবিকতা সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে কৃষি খাতে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষক ফসলহানির শিকার হচ্ছেন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষিজ উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাও বড় ধরনের হুমকির মুখে।
বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং তীব্র গরমের অনুভূতি সিলেটবাসীর জন্য নতুন উদ্বেগ নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প-কারখানার প্রসার এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের কারণে নগরে 'হিট আইল্যান্ড' প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে তীব্র গরমের অনুভূতি বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এই জলবায়ু সংকটের মূল কারণ মূলত মানবসৃষ্ট। শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। পাশাপাশি, বনভূমি ধ্বংস ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে, যা জীবমণ্ডলের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে মানবসৃষ্ট কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা আবশ্যক। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, ব্যাপক বনায়ন এবং বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় উন্নত অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।