হতাশা প্রকাশ করে দলীয় পদ-পদবী থেকে অব্যাহতির ঘোষণা দিয়েছেন তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) তাহিরপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাহিরপুর উপজেলা শ্রমিকদলের সভাপতি ফেরদৌস আলম।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে রুহুল আমিন মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনে নিহত সকল শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে রুহুল আমিন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রায় ২৫ বছর আগে সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নজির হোসেনের হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। বিগত ১৭ বছর ধরে মামলা, হামলা, জেল-জুলুমসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি ও তার পরিবার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হলেও সেই আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। জুলাই আন্দোলনের পর দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জনগণ দেখেছিল, তাহিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর তাহিরপুর উপজেলায় লুটপাট ও দুর্নীতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, যাদুকাটা এলাকায় গ্রাম থেকে গ্রাম কেটে অবাধে বালু লুট করা হচ্ছে। রক্তি, পাটলাই, বৌলাই ও যাদুকাটা নদীপথে চলাচলকারী নৌযান আটকে নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নদী থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঘাঘটিয়া গ্রামে বিশাল বাঁশঝাড়সহ বিস্তীর্ণ এলাকা দলীয় নেতারা কিনে রেখেছেন এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর এসব এলাকায় ব্যাপকভাবে বালু লুটের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী চারাগাঁও, বাগলী ও বড়ছড়া—এই তিনটি শুল্কস্টেশন দখল করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাওর অধ্যুষিত এই নির্বাচনী এলাকায় দিন দিন হাওরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মৎস্য সম্পদ, বন ও গাছপালা উজাড় হচ্ছে, এমনকি হাওরের মূল্যবান কান্দার মাটিও লুট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রুহুল আমিন বলেন, “হাওরের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি চলছে, কিন্তু হাওর রক্ষা কিংবা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দলের কোনো দিকনির্দেশনা নেই। উল্টো লুটপাট চললেও দলের কোনো মাথাব্যথা নেই।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিএনপি জনগণের প্রত্যাশিত একটি সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতারা দুর্নীতি ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়লেও জনতার সামনে মিথ্যা ও প্রতারণামূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ অবস্থায় বিবেক ও দেশপ্রেমের তাড়না থেকে দলীয় সকল পদ-পদবীসহ বিএনপির রাজনীতি থেকে এই মুহূর্ত থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দেন রুহুল আমিন। তিনি বলেন, “বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক রইল না। আমরা জানি আমাদের চলে যাওয়ায় বিশাল এই দলের কোনো ক্ষতি হবে না, তবে নিজেদের জায়গা থেকে প্রতিবাদটুকু জানিয়ে গেলাম।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধারা এতে ব্যথিত হতে পারেন, সে দায় সম্পূর্ণ নিজেরাই বহন করবেন তারা। তবে সামাজিক সম্পর্ক অটুট থাকবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কারও আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তাহিরপুর উপজেলা শ্রমিকদলের সভাপতি ফেরদৌস আলম, যিনি রুহুল আমিনের বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।