বহুল আলোচিত পুলিশ হেফাজতে নিহত রায়হান হত্যা মামলায় (দায়রা মামলা নং: ৬২০/২০২২) মামলার প্রধান আসামি এসআই আকবর হোসেন ভূইয়া গত ৪ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ থেকে জামিন লাভ করেন।
তার জামিনের আদেশ ১০ আগস্ট সিলেট মহানগর আদালতে পৌঁছালে আদালত ২০ হাজার টাকা বন্ডে ৬ মাসের অন্তর্বর্তী জামিনের মুক্তির আদেশ প্রদান করেন। সিলেট মহানগর দায়রা জজের ভারপ্রাপ্ত বিচারক রাজীব কুমার বিশ্বাস এ আদেশ প্রদান করেন। আদেশ নং- ১২৪, তারিখ: ১০/০৮/২০২৫ ইং।
জামিনের মুক্তির আদেশে মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক লিখেছেন, ‘মাননীয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং ৫০৫৮৯/২০২৫, যা মহানগর দায়রা মামলা নং ৬২০/২০২২, কোতোয়ালী থানার মামলা নং ২০, তারিখ ২২/১০/২০২০ খ্রি., কোতোয়ালী জি/আর- ৪২৩/২০২০ খ্রি., এর বিগত ০৪/০৮/২০২৫ ইং তারিখের আদেশের অনুলিপি, স্বারক নং ৬৭০২৭, তারিখ: ০৬/০৮/২০২৫ খ্রি., মূলে পাওয়া গিয়াছে। আসামি মোঃ আকবর হোসেন ভূইয়া, পিতা: জাফর আলী ভূইয়া, মাতা: তাহমিনা বেগম, সাং- বগইর, থানা: আশুগঞ্জ, জেলা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বর্তমানে সাময়িক বরখাস্তকৃত এসআই (বিপি নং ৮৮১৪১৭১১১৮), সাবেক ইনচার্জ, বদরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি, এসএমপি, জেলা: সিলেট-এর পক্ষে নিযুক্ত কৌসুলি দরখাস্ত দাখিলক্রমে এডভোকেট প্রত্যয়নপত্রসহ একখানা দরখাস্ত দাখিল করেন। মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ০৬ (ছয়) মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর হওয়ায় প্রার্থনা করেন।
মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ অত্র মামলার আসামি মোঃ আকবর হোসেন ভূইয়াকে বিগত ০৪/০৮/২০২৫ ইং তারিখের আদেশমূলে অত্র আদালতের সন্তুষ্টি মোতাবেক ০১ (এক) বছরের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন এবং আদেশটি সম্পর্কে মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা হইতে প্রদত্ত Web. Ref. No. 2025067612 সূত্রের প্রেক্ষিতে অত্র আদালতের সেরেস্তা সহকারী কৃপাসিন্ধু দাস-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট www.supremecourt.gov.bd-এ সার্চ করে ১০/০৮/২০২৫ খ্রি. সকাল ১১:০০ ঘটিকায় নিশ্চিত হওয়া গিয়াছে। প্রিন্ট কপি নথিতে রাখা হোক।
মাননীয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা হইতে ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং ৫০৫৮৯/২০২৫ (টেভার নং: ২৯২৩৯/২০২৫) (দায়রা: ৬২০/২০২২, কোতোয়ালী মডেল থানার মামলা নং ২০, তারিখ ১২/১০/২০২০ খ্রি., কোতোয়ালী জি/আর- ৪২৩/২০২০ খ্রি.) এর বিগত ০৪/০৮/২০২৫ খ্রি. তারিখের কপি দেখলাম। মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের সদয় নির্দেশানুসারে আপিলকারী-আসামি মোঃ আকবর হোসেন ভূইয়াকে আদালতের সন্তুষ্টি মোতাবেক মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের আদেশে ০৬ (ছয়) মাসের (অর্থাৎ ০৩/০২/২০২৬ খ্রি. তারিখ পর্যন্ত) অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করায়, সিলেট বারের একজন বিজ্ঞ আইনজীবী ও স্থানীয় একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির জিম্মায় ২০,০০০/- টাকার বন্ড সম্পাদন পূর্বক আসামির জামিননামা দাখিল করা হোক।’
এরপর মোঃ আকবর হোসেন ভূইয়ার আইনজীবী বন্ড দাখিল করলে মামলার আদেশ নং- ১২৫, তারিখ: ১০/০৮/২০২৫ ইং-এর মাধ্যমে অত্র জামিনপ্রাপ্ত আসামির অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে আদেশ প্রদান করা হয়।
পরে একই দিন সন্ধ্যায় এসআই মোঃ আকবর হোসেন ভূইয়া সিলেট কারাগার ২ (এখানে মহানগরের আসামীদের রাখা হয়) থেকে মুক্তি পান।
এই জামিন লাভের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও সিলেট মহানগর দায়রা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ বদরুল ইসলাম অ্যাডভোকেট বলেন- ‘এটা উচ্চ আদালতের জামিনের আদেশ। এখানে বিচারিক আদালতের কোনো হাত নেই। আমরাও এ জামিন আদেশে হতাশ।’
রায়হান হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম এ ফজল চৌধুরী ইমজা নিউজ-কে বলেন- ‘এই মামলায় যুক্তিতর্ক চলমান। এই অবস্থায় মূল আসামি জামিন পাওয়ায় হতাশ বাদীপক্ষ।’
এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, ২০২২ সালে মহামান্য হাইকোর্ট মামলাটি ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিলেও বিচারিক আদালত সে নির্দেশনা অনুসরণ করেননি। যে কারণে মূল আসামিও জামিন পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। ১০ অক্টোবর ভোর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। শুরুতে পুলিশ ছিনতাইকারীর হাতে মৃত্যু বলে প্রচার চালায় পুলিশ। পরবর্তীতে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে এ ঘটনায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী মামলা করেন। মামলার পর সিলেট মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হানকে নির্যাতনের সত্যতা পায়। ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ওই বছরেই ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর পুলিশি হেফাজত থেকে কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রধান অভিযুক্ত আকবরকে ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন।