চার দফা বন্যায় ফসল-ঘর সব শেষ, এখন ভাঙনের শঙ্কা

নীলফামারীর ডিমলায় এবারের বর্ষা মৌসুমে পরপর চার দফা বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর এখন তা কমতে শুরু করেছে। এতে মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ফসলের বিপুল ক্ষতি ও নদীভাঙনের নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।শনিবার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবার একই সময়ে যা ছিল বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার উপরে। অর্থাৎ মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় পানি কমেছে ৫৩ সেন্টিমিটার।পানি কমায় ডিমলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা থেকে পানি সরে যেতে শুরু করেছে। এতে মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সব এলাকা স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে। অনেকে ইতোমধ্যে বাড়িঘর পরিষ্কার করছেন, কেউ কেউ বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছেন।তবে চলতি মৌসুমে পরপর চার দফা বন্যায় রোপা আমনসহ বিভিন্ন ফসলের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৪৩ একর আমন ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি সবজি বাগান ও অন্যান্য কৃষিপণ্যেরও ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে প্রকৃত ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে।অনেক কৃষকের অভিযোগ, এবারের বন্যায় ধান রোপণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গবাদিপশুর জন্য শুকনো খড় নষ্ট হওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। মাছ চাষিরা পুকুর ও ঘেরের পাড় ভেঙে মাছ ভেসে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।চলতি বন্যায় উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই, পূর্ব ছাতনাই, খগাখরিবাড়ি, টেপাখরিবাড়ি, গয়াবাড়ি, খালিশা চাপানি ও ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি ছিল। তাদের অভিযোগ, এখনো সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি। তারা ত্রাণ নয়, বরং তিস্তা তীর রক্ষা ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান চান।পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছরই বন্যা আসে, ফসল নষ্ট হয়। এবার চারবার পানি এসে সব শেষ করে দিল। সরকারি সাহায্য পাইনি, চাই তিস্তার ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা।”খালিশা চাপানি ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামের গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, “বন্যায় ঘরবাড়ি সব পানিতে ছিল। পানি নেমে গেলেও কষ্ট কমেনি। ঘরে খাবার নেই, শুকনো খড়ও নেই গরুর জন্য।”গয়াবাড়ি ইউনিয়নের মৎস্যচাষি হাসান আলী জানান, “পুকুরের সব মাছ বেরিয়ে গেছে। এবার কীভাবে ঋণ শোধ করব, ভেবে পাচ্ছি না।”একই এলাকার ভুক্তভোগী আরেক কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমাদের ফসল নদী ভাঙনের সঙ্গে ভেসে গেছে, কয়েক বছরের পরিশ্রম এক মুহূর্তে শেষ।”উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মীর হাসান আল বান্না বলেন, “প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করা হলেও চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নে আরও কয়েক দিন লাগবে। সরকারি সহায়তা এলে তা সঠিকভাবে বিতরণ করা হবে।”ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, “দ্রুত পানি কমায় তিস্তার তীরে ভাঙন দেখা দিতে পারে। এজন্য আমরা প্রস্তুত আছি। পর্যাপ্ত জিওব্যাগ মজুত রয়েছে, যেখানে ভাঙন দেখা দেবে, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, “স্বল্পমেয়াদি এই বন্যায় গ্রামীণ অবকাঠামো, ফসল ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে জিআর হিসেবে ৩০ মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা পাওয়া গেছে। আরও সহায়তার জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫ হাজার ২০৯ জনকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।”তিনি আরও জানান, পশ্চিম ছাতনাই, গয়াবাড়ি ও খগাখরিবাড়ি ইউনিয়নে ইতোমধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তালিকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ইউনিয়নেও এ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নদী ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নদী ড্রেজিং ও পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। এছাড়া রিভেটমেন্ট, গ্যাবিয়ন ও জিওব্যাগের পাশাপাশি বাঁশ, বেত ও দেশীয় গাছপালা রোপণ করে তীরকে প্রাকৃতিকভাবে স্থিতিশীল রাখা যায়। তাছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত অববাহিকা পরিকল্পনা গ্রহণ করলে নদী ভাঙন নিয়ন্ত্রণযোগ্য হবে।