দিরাই-শাল্লার নির্বাচন: গ্যাস, ‘আমার ভাই’ ও উন্নয়নের বাস্তব প্রেক্ষাপট

দিরাই-শাল্লার নির্বাচন: গ্যাস, ‘আমার ভাই’ ও উন্নয়নের বাস্তব প্রেক্ষাপট- দুই কথায় কার জিত?

​দিরাই-শাল্লা নির্বাচনকে প্রসঙ্গ করে সম্প্রতি মোহাম্মদ শিশির মনির এবং তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেলের ফেসবুক লাইভ আলোচনাটি গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। এই লাইভে উত্থাপিত ‘গ্যাস’ প্রসঙ্গ এবং ‘আমার ভাই’ আলোচনাটিকে আমি বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। যদিও আমি বিশ্লেষক নই!

​গ্যাস সংযোগ: অলীক স্বপ্ন?

​লাইভে পাভেল চৌধুরীর পক্ষ থেকে দিরাই-শাল্লাবাসীর জন্য গ্যাস সংযোগের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, আমার মতে তা সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ. মান্নানের সুনামগঞ্জে বিমানবন্দর নির্মাণের স্বপ্নের মতোই অযৌক্তিক, অপ্রাসঙ্গিক ও কিছুটা হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, কেন?
​কারণ, যেখানে বিভাগীয় শহর সিলেটের অনেক জায়গায় এবং এমনকি জেলা শহর সুনামগঞ্জের বহু পাড়ায় আজও গ্যাস সংযোগ অধরা, জীবন চলে সিলিন্ডার গ্যাসে, সেখানে দিরাই-শাল্লার মতো একটি থানা শহরে বৃহৎ কলকারখানা ছাড়া শুধু গৃহস্থালী ব্যবহারের জন্য গ্যাস সংযোগের প্রত্যাশা করা নিছকই স্বপ্নবিলাস। আর বিশাল শিল্প-কারখানার গল্প যদি আসে, তাহলে অনেক প্রশ্ন উঠবে, যেমন—এম সাইফুর রহমান অথবা এম. এ. মান্নানের মতো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হতে হবে এবং তাও ৫-১০ বছর একটানা মন্ত্রিত্ব থাকতে হবে, যেটা দিরাই-শাল্লার কোনো নেতার পক্ষে বর্তমানে সম্ভব নয় বললেই চলে।
​তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নেই যে দিরাই-শাল্লার মানুষ গ্যাস পাবে, তবে সেই সংযোগ কি সাধারণ নিয়মে আসবে নাকি বিশেষ ক্ষমতাবলে? যদি উত্তর হয় সাধারণ নিয়ম, তবে অসংখ্য গ্রাম-গঞ্জের পাশ দিয়ে লাইন টেনে কেবল একটি থানা শহরে গ্যাস দেওয়া চরম বৈষম্য ছাড়া কিছুই নয়। গ্যাস সংযোগের এই প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে গ্যাস ফিল্ডের আশেপাশের এলাকা বা উপজেলায় সামগ্রিকভাবে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা একবার যাচাই করে নেওয়া উচিত। যার উঠানে গ্যাসের খনি, সে-ই যদি পায় না, তাহলে আমার আপনার সেই গ্যাসের আশা করা শুধুই কল্পনা। বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যেভাবে মন্ত্রিত্বের জোরে দিরাইয়ে রেললাইন এনেছিলেন স্বপ্নে, কেবল তেমনই কোনো ‘বিশেষ ক্ষমতা’ ছাড়া গ্যাস সংযোগ পাওয়া অসম্ভব বলে আমি মনে করি।

​’আমার ভাই’ প্রসঙ্গ: কৌশলগত বিজয়

​আলোচনার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল ‘আমার ভাই’ প্রসঙ্গ। শিশির মনিরকে দু-একটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্মার্টলি এড়িয়ে গেলেও পুরোপুরি স্পর্শ করেননি, এমন বলা যাবে না। তাঁর বক্তব্যে “আমার ভাই জিতলে আমি আমার দাবি (আর্গুমেন্ট) নিয়ে ভাইয়ের কাছে যাব,” এমন ইঙ্গিত ছিল যে, তাঁর ভাইয়ের (পাভেলের) বিজয়ের মাধ্যমেই তিনি এলাকার জন্য কাজ করতে চান। “আমার ভাই যদি বিজয়ী হন, তবে উনার কাছে আমরা আমাদের দাবি নিয়ে যাব, “আমার সভায় উনাকে দাওয়াত দিব, আশা করি উনিও দিবেন”— এই ধরনের মন্তব্য অনেকটা নিজে অন্যকে বিজয়ী করে দেওয়ার মতোই। যা এক অর্থে অন্যের বিজয়ে শিশির মনিরেরই বিজয়। আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণে মনে হয়েছে, লাইভটিতে পাভেল চৌধুরী গ্যাসের যুক্তির কাছে পরাজিত হয়েছেন, আর শিশির মনিরের ‘আমার ভাই’ প্রসঙ্গটিই যেন অধিক গুরুত্ব পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। অতি আবেগপ্রবণ না হয়ে গভীরভাবে লাইভটি পর্যবেক্ষণ করলে এই সত্যতা মিলবে।

​উন্নয়নের প্রশ্নে আমাদের ঐকমত্য:

​তবে লাইভের শেষাংশে শিশির মনির একটি দারুণ বাস্তব ও সঠিক কথা বলেছেন, যা সকল মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে। আর তা হলো: কাজ করার সদিচ্ছা থাকলে সরকারি দলের এমপি নাকি বিরোধী দলের এমপি—তা বড় কথা নয়; এখানে কাজ করার ইচ্ছা ও সক্ষমতাই মুখ্য।
​কে হারল আর কে জিতল, তা নিয়ে আমার আর আপনার মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। আমি হয়তো একজনকে ভালো বলব, আপনি আরেকজনকে। কিন্তু একটা জায়গায় আমাদের অবশ্যই একমত হতে হবে, আর তা হলো— দিরাই-শাল্লার উন্নয়ন। সেই উন্নয়নের প্রশ্নে আমাদের সকলের মতামত যেন এক ও অভিন্ন হয়। ​আল্লাহ হাফেজ।

​জাকারিয়া হোসেন জোসেফ
সংবাদকর্মী,
২০ অক্টোবর, ২০২৫ ইং