সুনামগঞ্জে মানবপাচারের মরণফাঁদে নিঃস্ব শত পরিবার

ছবিঃ সিলেট ভয়েজ

হাওরের উত্তাল ঢেউয়ের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে দালালদের পাতা মরণফাঁদ যেখানে জগন্নাথপুরের শায়েক আহমদের মতো অসংখ্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অকালে। পৈত্রিক ভিটেমাটি আর গোয়ালের গরু বিক্রি করে ১২ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন শায়েকের বাবা আখলুছ মিয়া, কিন্তু সেই অর্থ তাঁর সন্তানের জন্য ইউরোপের মাটি নয় বরং নিশ্চিত করেছে সাগরের অতল গহ্বর। গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা সেই অভিশপ্ত রাবারের বোটটি যখন দিক হারিয়ে সাগরে ভাসছিল, তখন খাবার আর পানির অভাবে একে একে ১৮টি প্রাণ নিভে যায় যার মধ্যে শায়েকও ছিলেন একজন। দুই দিন নৌকায় পড়ে থাকা সেই নিথর দেহগুলো যখন পচতে শুরু করে, তখন সেগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় যা যেকোনো মানবিক হৃদয়কে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এই নির্মম ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র যারা স্থানীয় সহজ-সরল পরিবারগুলোকে দ্রুত ভাগ্য পরিবর্তনের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে। আজিজুল ইসলাম, শাহিন মিয়া, এনাম আহমদ কিংবা জসিম উদ্দিনদের মতো দালালরা এখন এলাকায় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে যারা জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। দিরাইয়ের মুজিবুর রহমানের মতো অনেক দালাল মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানেই দালানকোঠা আর অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন যা মূলত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর রক্ত পানি করা অর্থ। এমনকি প্রবাসে থেকেও অনেকে মুঠোফোনের মাধ্যমে এই পাচার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন যেখানে সালেহ আহমেদের মতো ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে বারবার।

দালালদের এই দৌরাত্ম্যে কেবল অর্থ নয়, সুনামগঞ্জের দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ঘরে ঘরে এখন শুধুই আহাজারি আর স্বজন হারানোর আর্তনাদ। কোনো কোনো অভিভাবক ভাগ্যকে দোষ দিলেও অনেকে সরাসরি এই মৃত্যুব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলছেন যেন আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেও বিদেশে অবস্থানরত মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পাশাপাশি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার আশ্বস্ত করেছেন যে অভিযুক্তরা দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকুক, তাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা হবে যেন হাওরাঞ্চলের যুবসমাজকে আর এমন আত্মঘাতী পথে পা বাড়াতে না হয়।